মারজিয়া নাবাভিনিয়া ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ নার্স ও স্নেহময়ী মা। ইরানে জানুয়ারি মাসের বিদেশি মদদপুষ্ট দাঙ্গার সময় তিনি নিজের কর্মস্থলে সশস্ত্র হামলার ঘটনায় জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা যান। তার পাঁচ বছরের মেয়ে জয়নাব আজও জানে না, কীভাবে এক মুহূর্তে তার পুরো পৃথিবী বদলে গেল। সে আজও অপেক্ষা করে, কখন তার মা দরজা দিয়ে হেঁটে ঘরে ফিরবে।
এই গল্প শুধু একজন নার্সের মৃত্যু নয়, এটি একটি পরিবারের ভেঙে পড়ার গল্প, একটি শিশুর শৈশব হারানোর গল্প, আর একটি মায়ের জীবনের নির্মম সমাপ্তির গল্প। মারজিয়া নাবাভিনিয়া ছিলেন আহওয়াজ শহরের এক সাধারণ পরিবারের মেয়ে। সাত সদস্যের একটি ধর্মপরায়ণ পরিবারে বড় হওয়া মারজিয়া ছোটবেলা থেকেই ছিলেন শান্ত, ভদ্র এবং মেধাবী। আঁকাআঁকি ও সুন্দর লেখায় তার বিশেষ দক্ষতা ছিল। বড় হয়ে তিনি সমাজের সেবাকেই জীবনের লক্ষ্য বানান। একজন নার্স ও ধাত্রী হিসেবে তিনি নিষ্ঠা, সাহস আর মানবিকতা নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কোভিড-১৯ মহামারির ভয়াবহ সময়েও, গর্ভবতী অবস্থায় তিনি হাসপাতালের দায়িত্ব ছেড়ে যাননি, সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে মানুষের সেবা করে গেছেন।
মারজিয়া ছিলেন একজন দায়িত্বশীল স্ত্রী এবং একজন আদর্শ মা। প্রতিবছর ঈদে গাদির উপলক্ষে তিনি প্রতিবেশীদের জন্য খাবার রান্না করতেন, নিজের আয়ের একটি অংশ দরিদ্রদের সাহায্যে দিতেন। তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভালোবাসা ছিল তার পাঁচ বছরের মেয়ে জয়নাব। কাজ শেষে ঘরে ফিরলে জয়নাব দৌড়ে গিয়ে মায়ের হাতে চুমু দিত, তাকে জড়িয়ে ধরত, তার ক্লান্তি দূর করার চেষ্টা করত। মা-মেয়ের সম্পর্ক ছিল গভীর, নির্ভরতার আর ভালোবাসায় ভরা।
ঘটনার দিন মারজিয়া রাশত শহরের ইমাম সাজ্জাদ (আ.) চিকিৎসাকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সেই সময় সশস্ত্র বিশৃঙ্খলাকারী গোষ্ঠী বিভিন্ন জায়গায় হামলা চালাচ্ছিল, এমনকি চিকিৎসাকেন্দ্র ও জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানেও আগুন দেওয়া হচ্ছিল। ওই দিন চিকিৎসাকেন্দ্রটিও আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। মারজিয়া তখনো চেষ্টা করছিলেন তার রোগীকে নিরাপদে বের করে আনতে। সেই সময় আগুনের মধ্যে পড়ে যান তিনি নিজেই। আগুন এতটাই ভয়াবহ ছিল যে তার শরীরের বড় অংশ পুড়ে যায়, শুধু ডান হাতের একটি অংশ অক্ষত থাকে।
এই ঘটনার সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দিক হলো, তার পাঁচ বছরের মেয়ে জয়নাব সেই ঘটনার খুব কাছেই ছিল। সেদিন জয়নাব অস্থির হয়ে বাবাকে অনুরোধ করে তাকে চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যেতে। যখন তারা সেখানে পৌঁছায়, তখন পুরো ভবন আগুনে জ্বলছিল। সেই মুহূর্তে পাঁচ বছরের শিশুটির মুখ থেকে বেরিয়ে আসে একটি প্রশ্ন—“আমার মা-ও কি পুড়ে গেছে?” এই একটি বাক্যই একটি শিশুর জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিকে প্রকাশ করে।
সেই দিনের পর জয়নাবের জীবন পুরোপুরি বদলে গেছে। যে শিশু প্রতিদিন রাতে মায়ের বুকে ঘুমাত, সে এখন মায়ের রেখে যাওয়া কাপড় জড়িয়ে ধরে নিরাপত্তার গন্ধ খোঁজে। মায়ের কণ্ঠ, মায়ের স্পর্শ, মায়ের উষ্ণতার স্মৃতি তাকে তাড়া করে ফেরে। তার মিষ্টি শৈশবের জায়গা নিয়েছে দুঃস্বপ্ন, ভয় আর অস্থিরতা। পাঁচ বছর বয়সেই সে শুধু মাকে হারায়নি, সে নিজের নিরাপদ পৃথিবীকেও হারিয়েছে।
মারজিয়ার পরিবার এখন রাশতের “গুলজার-এ-শোহাদা” কবরস্থানে তার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে তার স্মৃতি ধরে রাখে। তার বোন মাসুমাহ বলেন, তারা এখনও মনে করেন তার আয়োজিত দোয়া অনুষ্ঠান, প্রতিবেশীদের জন্য রান্না করা খাবার, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর গল্পগুলো। আজ এসব শুধু স্মৃতিতে আর ছবির অ্যালবামে বন্দি হয়ে আছে।
মারজিয়া নাবাভিনিয়ার গল্প শুধু একটি দুঃখজনক বিষয় নয়। এটি চরম সহিংসতার বাস্তব চেহারা তুলে ধরে। এমন সহিংসতা, যার কোনো মানবিক সীমা নেই, যা নার্সকে আগুনে পোড়ায়, চিকিৎসাকেন্দ্রে আগুন দেয়, আর পাঁচ বছরের শিশুর জীবনকে আজীবনের জন্য ভেঙে দেয়। এই গল্প আমাদের সামনে একটি গভীর প্রশ্ন রেখে যায়—যারা একজন সেবিকা-মাকে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করতে পারে, তারা কি কখনো মানবতা, ন্যায়বিচার বা স্বাধীনতার কথা বলতে পারে? এটি শুধু ইরানের গল্প নয়, এটি মানবতার গল্প।